রবিবার ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১৭:৩৯
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনা: চাপের রাজনীতি না কি বাস্তবতার স্বীকৃতি?

যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনা এখন আর কেবল কূটনৈতিক অচলাবস্থার গল্প নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা, দ্বিচারিতা এবং বাস্তবতা অস্বীকারের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক দলিল। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটন যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে, তা কোনোভাবেই সমাধানের দিকে নিয়ে যায়নি। বরং এই নীতিই আজ সংকটকে আরও গভীর ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এখন প্রশ্ন আর এই নয় যে ইরান কী চায়—প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি আদৌ বাস্তবতা মেনে নিতে প্রস্তুত?

ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি: যুক্তরাষ্ট্রের ‘চাপ’ নীতি
চাপ, নিষেধাজ্ঞা, হুমকি ও বিচ্ছিন্নকরণ— ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি শুধু ব্যর্থই নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রমাণিত হয়েছে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে একতরফা অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক হুমকি ও তথ্যযুদ্ধ— সবই ব্যবহার করা হয়েছে। ফল কী?

ইরান তার অবস্থান বদলায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ছিল কূটনীতির এক বিরল সাফল্য। ইরান নজিরবিহীন স্বচ্ছতা দেখিয়েছিল, কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছিল। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, নিজেই স্বাক্ষর করা চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে এসে প্রমাণ করেছে—ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি কাগজের চেয়েও কম মূল্যবান।

এই বাস্তবতা আজ আর কারও অজানা নয়।

আসল সমস্যা পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, ইরানের ‘স্বকীয়তা, স্বাধীনতা’
এ কথা বলার সময় এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়। আসল সমস্যা হলো— ইরান একটি স্বাধীন, প্রভাবশালী এবং অ-নিয়ন্ত্রনযোগ্য আঞ্চলিক শক্তি। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র যে একচ্ছত্র প্রভাব বজায় রাখতে চায়, ইরান তার পথে একটি বড় বাধা।

এই কারণেই পারমাণবিক ইস্যুকে বারবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো মানবাধিকার, কখনো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, কখনো আঞ্চলিক নীতি— একটির পর একটি শর্ত জুড়ে দিয়ে আলোচনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অকার্যকর করা হয়েছে। এটি কূটনীতি নয়; এটি চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি।

ইরানকে বাদ দিয়ে কোনো সমীকরণ মেলানো অসম্ভব
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিভ্রম হলো— ইরানকে উপেক্ষা করে বা কোণঠাসা করে পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা আনা যাবে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইরান আজ আর কোনো প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়। এটি একটি বাস্তব আঞ্চলিক শক্তি, যার রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। এই প্রভাব কোনো বিদেশি অনুগ্রহে আসেনি— এটি এসেছে আত্মনির্ভরতা, প্রতিরোধ এবং ধারাবাহিক কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে।

ইরানকে বাদ দিয়ে যে কোনো আঞ্চলিক পরিকল্পনা অবাস্তব, অকার্যকর এবং শেষ পর্যন্ত বিপর্যস্ত হতে বাধ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: কূটনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা তেহরানে নয়— ওয়াশিংটনে। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা ইহুদিবাদী লবিগোষ্ঠী, অস্ত্র শিল্প এবং স্থায়ী সংঘাত-নির্ভর স্বার্থচক্রের কাছে কার্যত জিম্মি।

প্রতিটি প্রশাসন আগের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে, প্রতিটি নির্বাচন পররাষ্ট্রনীতিকে অনিশ্চিত করে তোলে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আজ এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যার সঙ্গে চুক্তি করা মানেই অনিশ্চয়তা গ্রহণ করা।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পক্ষ থেকে কার্যকর ও বাস্তব নিশ্চয়তা দাবি করা কোনো ‘অজুহাত’ নয়— বরং এটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও অপরিহার্য।

বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই
একটি সত্য আজ দ্ব্যর্থহীন— চাপ দিয়ে ইরানকে বাধ্য করা যাবে না। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান ভাঙা যাবে না। হুমকি দিয়ে তাকে কৌশলগত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না।

যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই উত্তেজনা কমাতে চায়, যদি সে পশ্চিম এশিয়ায় তার ব্যয়বহুল ও ব্যর্থ উপস্থিতি কমাতে চায়, তবে তাকে মৌলিকভাবে চিন্তাধারা বদলাতে হবে। ইরানের অধিকার স্বীকার করতে হবে, নিষেধাজ্ঞা সত্যিকার অর্থে প্রত্যাহার করতে হবে এবং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নিশ্চয়তায় রূপ দিতে হবে।

এটি কোনো ছাড় নয়— এটিই এখন বাস্তব ও সময়োপযোগী রাজনীতি।

উপসংহার: দায়িত্ব কার?
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনা আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার দায় ইরানের নয়। দায় সেই শক্তির, যে শক্তি বারবার চুক্তি ভেঙেছে, বাস্তবতা অস্বীকার করেছে এবং চাপের রাজনীতিকে কূটনীতির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এখনও সময় আছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সংঘাতের পথ ছেড়ে বাস্তবতার পথে হাঁটতে পারে। কিন্তু যদি সে আবারও পুরোনো ব্যর্থ কৌশলেই ফিরে যায়, তবে এর পরিণতির দায়ভার সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের কাঁধেই থাকবে।

ইতিহাস এই ব্যর্থতার সাক্ষী থাকবে— এবং রায়ও দেবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha